Shaanxi, China
sazib.online@gmail.com

আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়

আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়

বেশ বহু বছর আগে আমি এক বাংলাদেশের সামরিক অফিসারের সাথে কথা প্রসঙ্গে তালেবানের কথা বলতেছিলাম, আমার যতদূর মনে পরে তাকে বলেছিলাম, পৃথিবীর কোনো স্বাধীনতাকামী সংগঠন সন্ত্রাসী হতে পারে না, এইজন্য তালেবানকে আমি সন্ত্রাসী বলতে চাই না।

অফিসার জবাবে বলল, তোমার ধারণা ভুল, তালেবান স্বাধীনতাকামী নই, এরা সন্ত্রাসী, এরা টেরোরিস্ট, এরা দেশদ্রোহী-মানবতাবিরোধী ইত্যাদি ইত্যাদি। উনি অনেক টাইটেল ব্যবহার করেছিল কিন্তু কোনো ব্যাখ্যাতে যায় নাই। শেষে আমাকে বলল তোমার সাথে আমি এই প্রসঙ্গ নিয়ে আর কথা বলতে চাই না, তুমি অন্য কিছু বলো, আমিও তখন আর তেমন কিছু বলি নাই।

এখন আসুন মূল প্রসঙ্গে, আপনারা যারা সুশীল, চেতনাবিদ অথবা ইসলামিস্ট, আল্ট্রা-ইসলামিস্ট আছেন, তারা হয়তো খুব বিস্ময়ের চোখে দেখেছেন প্রায় এত যুগ পর যে আমেরিকা তালেবানকে সন্ত্রাসী উপাধি দিয়েছিল, তারাই আবার তালেবানকে বীরযোদ্ধা খেতাব দিয়ে তালেবানদের জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।

তো এত বছর, আমাদের সমাজব্যবস্থা বা মিডিয়া বা সুশীলরা যে তালিম আমাদের দিয়েছেন, আমাদের পরবর্তি প্রজন্মকে যে ব্রেইনওয়াস দিয়েছেন, এখন তাদেরকে যদি প্রশ্ন ছুঁড়ে মারা হয়, আমেরিকার তথ্যের ভিত্তিতে যে তালেবানকে আপনি এত বছর সন্ত্রাসী বলে আসছিলেন এখন আপনার বক্তব্য কি তালেবানের ব্যাপারে?

নিশ্চিত তাদের কাছে কোনো উত্তর পাবেন না, কেননা তারাও জানে যে, নিজের ভূমি বহির্শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করাকে সন্ত্রাসী বলে না। বরং যারা অনুমতি ব্যতিত অন্যের ভূমিতে পা রাখে তারাই প্রকৃত সন্ত্রাসী।

একটা উদাহরণে যাওয়া যাক, ৭১ই যখন পাক বাহিনী আমাদের ভূমিতে আক্রমণ করলো, তখন যেই সকল মুক্তিবাহিনী বা গেরিলাবাহিনী তাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র ধরলো, এখন সেই সকল মুক্তিবাহিনীকে কি আপনি সন্ত্রাসী বলবেন?

অবশ্যই না, কেননা নিজের ভূমির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও এই ভূমির প্রতিটি বালিকণা রক্ষার্থে অস্ত্র ধরা বা প্রাণ বিলিয়ে দেওয়াকে সন্ত্রাসী বলে না, দেশপ্রেম বলে, যোদ্ধা বলে। ঠিক একইভাবে তালেবানরা যদি তাদের ভূমি আমেরিকার হাত থেকে রক্ষার্থে হাতে অস্ত্র তুলে নেই, তাহলে আপনি কোন যুক্তিতে এত বছর তাদের সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে আসছেন?

যদি আপনি এখনো বিশ্বাস করেন, তালেবান সন্ত্রাসী তাহলে আপনার একই যুক্তিতে আপনি আপনার মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিচ্ছেন, আপনি আপনার ৭ বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৯ বীরউত্তম, ১৭৫ বীর বিক্রম, ৪২৬ বীর প্রতীককে সন্ত্রাসী তকমা দিচ্ছেন। আপনি আপনার রাজনৈতিক আদর্শ বঙ্গবন্ধু অথবা মেজর জিয়াকে সন্ত্রাসী লিডার আখ্যা দিচ্ছেন। এখন আপনি সুশীল, সন্ত্রাসীর সংজ্ঞা ঠিক করেন।

সবই বুঝলাম, তাহলে প্রকৃত অর্থে বর্তমান বিশ্বের সন্ত্রাসী কারা? সন্ত্রাসীর মাপকাঠি কি? সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা হচ্ছে– যে সকল বিধ্বংসী কার্যকলাপ জনমনে ভীতির উদ্বেগ ঘটায়, ধর্মীয়, রাজনৈতিক অথবা নীতিগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কৃত রুচিবিরুদ্ধকাজ, ইচ্ছাপূর্বক সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার বিষয় উপেক্ষা অথবা হুমকি প্রদান করা।

সম্প্রতি ভারতে যে আগ্রাসী শাসন চলছে, সেগুলা স্পষ্টত সন্ত্রাসবাদের যে সংজ্ঞা তার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। সেক্ষেত্রে গুজরাটের কসাইখ্যাত মোদিকে আপনি সন্ত্রাসী বা তার কেবিনেটকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন বলতে পারেন। কেননা সন্ত্রাসবাদে বলা আছে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কার্যকলাপের মাধ্যমে জনমনে ভীতির সঞ্চার ঘটানোকে সন্ত্রাসী বলা হয়।

মূলত সন্ত্রাস দুই ধরণের হয়ে থাকে, একটা হচ্ছে অস্ত্র সন্ত্রাস আরেকটি হচ্ছে তথ্য সন্ত্রাস। কেউ অস্ত্রের মাধ্যমে ভীতির সঞ্চার করে আবার কেউ তথ্যের মাধ্যমে ভীতির সঞ্চার করে। অতএব এত বছর সুশীলদের টকশো থেকে, দাড়ি-টুপি থাকলেই যে সন্ত্রাসীর সংজ্ঞা শিখেছিলেন, এইগুলা আজ থেকে ডিলেট করে দেন। আর সন্ত্রাসবাদের তথ্য অনুসারে যারা এত বছর আপনাকে এই মিথ্যে তথ্য দিয়ে যে ভীতির সঞ্চার করেছে, তারাও এক প্রকার সন্ত্রাসী, অতএব তাদের থেকেও সতর্ক থাকুন।

এখন একটা প্রশ্ন আসতে পারে, এই বিশ্বে যে হামলা গুলা হচ্ছে, তাদের মাঝে যে সকল মুসলিম নামধারী আছে তারা কি সন্ত্রাসী নই? প্রথম কথা হচ্ছে সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম নেই, অতএব সে মুসলিম নাকি অমুসলিম এটা বিবেচ্য নই, সে একটা সন্ত্রাসী সেটাই বিবেচ্য। কেননা ইসলাম কখনই সন্ত্রাসীকে সাপোর্ট করে না, কোনো ধর্মই সন্ত্রাসীকে সাপোর্ট করে না। নতুবা আমি বলতাম মোদি একটা হিন্দু সন্ত্রাসী। হিন্দু ধর্মের কোথাও লিখা নাই, মানুষকে হত্যা করে হিন্দু ধর্ম কায়েম করো, এইগুলা হচ্ছে মোদির মত নেতাদের চাল কিন্তু ভারতীয় হিন্দুরা এটা বুঝতে পারছে না।

একইভাবে, ফিলিস্তিনের জনতা অথবা কাশ্মীরের জনতা অথবা চীনের উইঘর জনতা অথবা রাখাইনের জনতা, যদি তাদের ভূমি রক্ষার্থে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাহলে তাদের আপনি সন্ত্রাসী বলতে পারেন না কারন এরাও স্বাধীনতাকামী জনতা।

অতএব, সন্ত্রাস, সন্ত্রাসবাদী, সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা আগে আমাদের
আগে জানতে হবে, তালেবানের এই বিজয়ের ফলে বাংলাদেশের কয়েকজন টকশোবিদের জন্য আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে কেননা তারা আর উদাহরণ হিসেবে এই দেশটাকে মোল্লা উমরের আফগানিস্তান বানাতে দেওয়া যাবে না, বক্তব্যে দেখা যাবে না।

আর সেই সামরিক আংকেলের সাথে জীবদ্দশায় কখনো দেখা হলে বলবো ‘তালেবান নিয়ে আপনার বর্তমান মন্তব্য কি আর আপনার মেয়েকে কবে বিয়ে দিচ্ছেন?’ 🙃

©️ MD Sazibur Rahman Sajib । 02.03.2020 | China 🇨🇳

Tags: ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *