Shaanxi, China
sazib.online@gmail.com

লিবিয়ার মোয়াম্মার আল-গাদ্দাফির অজানা কিছু সত্য

স্বৈরাচার শব্দটির উদাহরণ দিতে গিয়ে অনেকেই লিবিয়ার মোয়াম্মার আল-গাদ্দাফি শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু আমি কখনই গাদ্দাফিকে স্বৈরাচার বলতে চায় না। কারন স্বৈরাচারের যে কয়টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলো যদি কোনো ব্যক্তিবিশেষের উপর না পাওয়া যায়, তাহলে তাকে স্বৈরাচার বলা বোকামি অথবা পশ্চিমাদের দেওয়া থিওরির অন্ধভক্তির নিদর্শন।

কর্নেল গাদ্দাফি প্রায়ই একাধারে ৪২ বছর লিবিয়া শাসন করেছেন। তাঁর শাসনামলে লিবিয়ার মত একটা দরিদ্র দেশ থেকে উন্নত বিশ্বের চেয়েও আধুনিক দেশ গঠন করেছিলেন লিবিয়াকে মাত্র ৪২ বছরে। পৃথিবীর ১৭তম বৃহত্তম দেশ লিবিয়ার প্রতি গাদ্দাফি প্রথম যে কয়টা জিনিসের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তার মাঝে শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা অন্যতম। গাদ্দাফি লিবিয়ার সমস্ত জনগণের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ন ফ্রি করে দিয়েছিলেন। এই জন্য তৎকালীন প্রায়ই 25% লিবিয়ানদের কাছে ইউনিভার্সিটি ডিগ্রি ছিল।

এমনকি যদি কোনো লিবিয়ান নাগরিক লিবিয়াতে পর্যাপ্ত শিক্ষা অথবা চিকিৎসা ব্যবস্থা না পেত, তাহলে বিদেশে সেই সকল নাগরিকদের সরকারি অর্থ দিয়ে পাঠানো হত। গাদ্দাফির শাসনামলে লিবিয়াতে কোনো ইলেকট্রিক বিল ছিল না, সমস্ত নাগরিকের জন্য এটি ফ্রি ছিল। 0% সুদবিহীন লোনের প্রচলন ছিল, যেহেতু ব্যাংকগুলো সব রাষ্ট্রীয় ছিল।

নতুন বিবাহিতদের জন্য গাদ্দাফি সরকার ৬০ হাজার লিবিয়ান দিনার অর্থাৎ প্রায়ই ৫০ হাজার ডলার উপহার হিসেবে দিত। কোনো লিবিয়ান যদি নতুন কোনো গাড়ি কিনতে চাইতো, তাহলে গাদ্দাফি সরকার সেই গাড়ির ৫০% দাম দিয়ে দিতো। প্রতি কেজি পেট্রলের দাম ছিল বাংলাদেশি টাকায় মাত্র ১১ টাকা। শুধু তাই নয়, লিবিয়ার তেল বিক্রির একটি অংশ সরাসরি সমস্ত লিবিয়ান নাগরিকের একাউন্টে চলে যেত।

লিবিয়াতে যদি কোনো মা সন্তান প্রসব করত, তাহলে গাদ্দাফি সরকার উপহারস্বরুপ সেই মাকে ৫ হাজার ডলার উপহার দিত। কৃষকদের কৃষি কাজের জন্য সরকার কর্তৃক সবকিছু ফ্রি দেওয়া হতো। যদি কোনো লিবিয়ান পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরি না পায়, তাহলে রাষ্ট্র তার বেতনের সমপরিমান টাকা প্রতি মাসে সেই নাগরিককে দিত, যতদিন সে চাকরি না পায়।

গাদ্দাফির শাসনামলে লিবিয়ার আন্তর্জাতিক কোনো ঋণ ছিল না এবং তাদের রিজার্ভ ছিল প্রায়ই $150 billion ডলার। লিবিয়াতে প্রত্যেকের নিজস্ব ঘর থাকা মানবাধিকারের মত দেখা হত, এমনকি গাদ্দাফি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, লিবিয়াতে প্রত্যেক নাগরিকের ঘর না হওয়া পর্যন্ত তার আপন মা-বাবাও ঘর পাবেন না।

গাদ্দাফির সবচেয়ে বড় যে কয়টা প্রকল্প ছিল, এর মাঝে ‘Great Man-Made River’ নামে একটি প্রকল্প ছিল। যেটা সমস্ত মরুভূমির দেশে পানির সহজলভ্যতা সৃষ্টি করবে। এই প্রজেক্টকে গাদ্দাফি ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এছাড়াও তিনি খাবারের সহজলভ্যতা বিপুলভাবে সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

২০১১ সাল অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর মোট অর্থের পরিমান ছিল প্রায়ই $200 বিলিয়ন ডলার, যেটা বর্তমান বিল গেটসের অর্থের ডাবল। মুসলিম সম্রাট মানসা মুসার অর্থের পরিমান ছিল $400 বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ গাদ্দাফির অর্থের পরিমান মুসার অর্থের অর্ধেক। আল-গাদ্দাফির প্রধান ব্যবসা ছিল তেল আর স্বর্ণ। এক লিবিয়াতে আল্লাহ্‌ এত পরিমাণ তেল আর স্বর্ণের মজুদ দিয়েছেন, তা আমার পক্ষে আপনাকে ব্যাখ্যা করে বুঝানো প্রায়ই অসম্ভব ব্যাপার।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, লিবিয়াকে এত নিখুঁতভাবে গড়ে তোলার পরও লিবিয়ানরা কেন জনসম্মুখে গাদ্দাফিকে হত্যা করলো? এই ঘটনা বুঝতে হলে আপনাকে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে গাদ্দাফির সম্পর্ক কেমন ছিল, তা প্রথমে বুঝতে হবে। সহজ ভাষায় যদি আপনাকে বলতে চায়, তাহলে বলতে হবে গাদ্দাফি পশ্চিমা বিশ্বের শোষণ আর নিপীড়নের কট্টর সমালোচক ছিলেন।

আরব ও আফ্রিকান দেশগুলাতে পশ্চিমাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে গাদ্দাফি আওয়াজ তুলে ছিলেন। তিনি আফ্রিকান ও আরবদেরকে পশ্চিমাদের শোষণ থেকে মুক্ত করতে বিভিন্ন ফ্রন্ট গঠন করেন এবং তিনি নিজেই এইগুলা পরিচালনা করতেন। গাদ্দাফি আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে অনেক যুগান্তকারি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন আফ্রিকানদের জন্য।

তিনি প্রথমেই সমস্ত আফ্রিকান ভিতরে ঐক্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই জন্য তিনি আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে একত্রিত হয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আফ্রিকার জ্যামাইকান বিখ্যাত নেতা মার্কাস গার্ভের ”United States of Africa” নীতিকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য গাদ্দাফি আফ্রিকাতে ডলার এর বিজনেস বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়ে আফ্রিকান গোল্ড দিনারের প্রস্তাব দেন। যেই গোল্ড দিনারের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছিল।

মূলত বিশ্ব বাজারে তেলের লেনদেনের জন্য আমেরিকান ডলার ব্যবহার করা হত। গাদ্দাফি সেই ডলার ব্যবস্থা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। এই জন্য তিনি নতুন কারেন্সি স্বর্ণের দিনারের প্রচলন শুরু করেছিলেন। গাদ্দাফির প্রস্তাব মেনে নিয়ে নাইজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মিশর এবং অ্যাঙ্গোলার মতো দেশগুলি তাদের মুদ্রা পরিবর্তন করতে প্রস্তুতও ছিল। আর এই মুদ্রা ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে গাদ্দাফি প্রায়ই 143 টন স্বর্ণ মজুদ করেছিলেন। গাদ্দাফির এই সমস্ত কলাকৌশলে লিবিয়াকে আফ্রিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ হিসাবে গড়ে তুলেছিল।

এই স্বর্ণের দিনারের ব্যবহার করে মূলত গাদ্দাফি আমেরিকানদের প্রভাব এড়াতে চেয়েছিলেন। ধীরে ধীরে আফ্রিকার অন্যান্য সরকার প্রধানরা যখন এই প্রকল্পকে সমর্থন দিতে শুরু করলো, তখন পশ্চিমাদের অর্থনীতি ব্যবস্থায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল।

তারপর ২০১১ সালে হিলারি ক্লিন্টনের তত্ত্বাবধায়নে ন্যাটো জোটের যৌথ হামলায় ও লিবিয়ানদের মধ্যে মিথ্যে প্ররোচনা দিয়ে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয় আল-গাদ্দাফি তথা আধুনিক লিবিয়ার জনককে। সেই সাথে ধ্বংস হয়ে যায় গোল্ড কারেন্সির প্রজেক্ট তথা আফ্রিকার স্বপ্ন। গাদ্দাফিকে যখন হত্যা করা হয় তখন প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের সামনে হিলারি গাদ্দাফির মৃত্যু নিয়ে উপহাস করেছিল। হিলারি হাসতে হাসতে বলেছিল ‘We came, We saw, he died‘।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই পুরো ঘটনা থেকে আমরা কি শিখতে পারলাম? খুব সাধারণ বেদুঈন পরিবারে জন্ম নেওয়া গাদ্দাফি তার জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত তার জাতি, তার লিবিয়ার উন্নয়নের জন্য লড়ে গিয়েছেন। একদিকে তার জাতির উন্নয়ন, অন্যদিকে পশ্চিমাদের কড়া সমালোচনা, আবার অপরদিকে আফ্রিকা-আরবদের একত্রিত করাই ছিল যেন তার অন্তিম উদ্দেশ্য।

গাদ্দাফি এত সাহসী ছিলেন যে তিনি জাতি সংঘের ভাষণে জাতি সংঘকে সামন্তবাদী বলে আখ্যা দিয়ে জাতি সংঘের নিরাপত্তা বাহিনীকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেন। তিনি সৌদি বাদশাহ আব্দুল্লাহকেও কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন মার্কিন বাহিনীকে বিভিন্ন কাজে সহায়তা দেওয়ার জন্য।

গাদ্দাফি পশ্চিমাদের শোষণ বুঝতে পেরে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় পশ্চিমারা গাদ্দাফিকে হত্যা করে। যেমনভাবে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে মিথ্যে অভিযোগে হত্যা করা হয়। বর্তমানে লিবিয়া একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, এই দেশে গৃহযুদ্ধ এখনো চলছে। যে আমেরিকা লিবিয়ানদের প্ররোচনা দিয়ে গাদ্দাফিকে হত্যা করতে উৎসাহী করেছিল, সেই আমেরিকা লিবিয়াকে ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বলা যায়।

মূলত পশ্চিমারা যদি গাদ্দাফি হত্যা না করত, তাহলে পশ্চিমাদের অর্থনীতিতে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দিত, পশ্চিমারা তাদের ব্যবসা ঠিকিয়ে রাখতে গাদ্দাফিকে হত্যা করেছে। লিবিয়ার পতন-উথান বহুবার আসতে পারে কিন্তু প্রাসাদ-অট্টালিকা ছেড়ে তাবুর ভিতরে যে গাদ্দাফি ঘুমাতেন তিনি হয়তো আর আসবে না লিবিয়ার নাগরিকের জন্য। পৃথিবী হয়তো পশ্চিমাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলা কোনো গাদ্দাফি আর দেখবে না।

একটা সময় পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ হয়ত লিবিয়ার গাদ্দাফির মত স্বৈরাশাসক চাইবে, জনগণের উন্নয়নের জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার জন্য। তাই আমি গাদ্দাফিকে স্বৈরাচার বলতে চায় না কারন স্বৈরাচারের যে সংজ্ঞা তার সাথে গাদ্দাফির কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। গাদ্দাফির একটি মাত্র অপরাধ তিনি রক্তপাতহীন অপারেশনের মাধ্যমে বাদশাহ ইদ্রিসকে হঠিয়ে লিবিয়ার ক্ষমতা হাতে নেন ও লিবিয়াকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন।

সারমর্ম হচ্ছেঃ পশ্চিমারা তাদের ব্যবসা ঠিকিয়ে রাখতে ও তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে যেকোনো দেশ অথবা জাতিকে কোনো কারন ছাড়াই ধ্বংস করে দিতে পারে। আর তাই গাদ্দাফি পশ্চিমাদের সাম্রাজ্যবাদিতার বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করে গেছেন তার আফ্রিকার জন্য। ঠিক একইভাবে আমাদেরকেও আজীবন লড়াই করে যেতে হবে ভারতের সাম্রাজ্যবাদিতার বিরুদ্ধে। ভারত আমাদের বন্ধু নয়, বন্ধু কখনও ভারত হতে পারে না।

🔴 এই আর্টিকেলে দেওয়া অনেক তথ্য পাঠকের মাথার উপর দিয়ে যেতে পারে অথবা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারে অতএব আমার সাজেশন থাকবে প্রতিটি তথ্য ধরে ধরে গুগলিং করা। 🔴

©️ MD Sazibur Rahman Sajib | 1.4.2020 | China 🇨🇳

Tags: , ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *