Shaanxi, China
sazib.online@gmail.com

সিংহপুরুষ ফখরে বাঙ্গাল মাওলানা তাজুল ইসলাম রহ. এর জীবনী

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ভূবন গ্রামে ১৩১৫ হিজরীতে ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে মাওলানা তাজুল ইসলাম রহ. জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মাওলানা আনোয়ার আলী রহ.। তিনি সে যুগের একজন প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। মাওলানা তাজুল ইসলাম রহ. এর পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন।

মাওলানা আনোয়ার আলী তাঁর প্রিয় সন্তানকে এক সময় নিকটস্থ স্কুলে ভর্তি করেন। তিনি নয় মাস স্কুলে পড়েন। শৈশব থেকেই মরহুম মাওলানার বিস্ময়কর প্রতিভার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। তাঁর এই বুদ্ধিরমত্তার ফলে তাকে পরবর্তীতে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়। তিনি শ্রীঘর মাদরাসা, সিলেটের বাহুবল মাদরাসা ও সিলেটের সরকারী আলিয়া মাদরাসায় অধ্যয়ন করেছিলেন। তখন সিলেট গভর্নমেন্ট আলিয়া মাদরাসার প্রধান অধ্যাপক ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম দেওবন্দের মুফতী আল্লামা সহুল উসমানী রহ.। মাওলানা তাজুল ইসলামকে প্রথম দর্শনেই তিনি বলেছিলেন- এই যুবক আগামীতে একজন বড় আলেম ও বুযুর্গ হবে।

১৩৩৮ হিজরিতে তিনি বিশ্ববিখ্যাত আরবি বিশ্ববিদ্যালয় দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। সেখানে তিনি মোট চার বছর পড়াশোনা করেন। দারুল উলুমে তিনি হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আকাইদ ও আরবি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। সেখানে শিক্ষাজীবনে তার বিষ্ময়কর মেধাশক্তির বিকাশ ঘটেছিল। সেখানে প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন। এ সময় তিনি সনদসহ কয়েক হাজার হাদিস ও ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ আল-হিদায় সম্পূর্ণ মুখস্থ করেন। দেওবন্দে তার পৃষ্ঠাপোষক ও বিশেষ শিক্ষক ছিলেন তদানীন্তন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম যুগের ইমামখ্যাত আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমিরি রহ.। তিনি ১৩৪২ হিজরী সনে লেখাপড়া শেষ করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

তিনি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ কেরাত বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশের ইলমে কেরাতের প্রবর্তক উজানীর কারী ইবরাহিম সাহেবের তৃতীয় কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন।

১৩৪২ হিজরীতে দেওবন্দ থেকে ফিরে এসে তিনি প্রথমে ঢাকায় এবং পরে কুমিল্লাস্থ জামিয়া মিল্লিয়ায় শাইখুল হাদীস হিসাবে নিযুক্ত হন। ১৩৪৫ হিজরী সনে ফখরে বাঙ্গাল রহ. জামিয়া ইউনুসিয়ার অধ্যক্ষ পদ গ্রহণ করেন। মাদরাসার দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে ইন্তিকাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৪২ বছর তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিজ দায়িত্ব পালন করেন।

ফখরে বাঙ্গাল রহঃ বৃহত্তর পরিসরে সমাজসেবা, ইসলামি শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং আরবি ও ইসলাম শিক্ষা বিস্তারের প্রেরণা নিয়ে তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের তিনি একজন নিঃস্বার্থ কর্মী ও নেতা ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্নে তিনি তদীয় শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ ওসমানি রহঃ এর পরামর্শে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামে যোগদান করে পাকিস্থান আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। পূর্ব পাকিস্তানে সর্বপ্রথম তিনি ও হযরত মাওলানা আতাহার আলি রহঃ বিরোধী দল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নিযামে ইসলাম পার্টি গঠন করেন। তদানীন্তন স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে তিনি ওলামায়ে কেরামকে নিয়ে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাদের এই আন্দোলনের ফলে আদর্শ প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৫৪ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে নির্বাচনে তিনি বিপুল অবদান রাখেন। এই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে নিযামে ইসলাম পার্টি ৩৬টি আসন লাভ করে। আল্লামা তাজুল ইসলাম পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নিযামে ইসলাম পার্টি এবং পরে নিখিল পাকিস্তান নিযামে ইসলাম দলের সহ সভাপতি পদে আসীন ছিলেন।

বেদাআত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। সমাজে প্রচলিত মিলাদ কিয়াম ও তথাকথিত মারেফাতের নামে ভন্ড ফকিরদের নানাবিধ বিরুপ প্রচারনার বিরুদ্ধে তিনি কার্যকরি ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ব্রাক্ষণবাড়িয়া শহর থেকে পতিতালয় উচ্ছেদ ও পতিতাদের পুনর্বাসন তার এক উল্লেখযোগ্য কীর্তি। তার পরামর্শ ও তত্ত্ববধানে ব্রাক্ষণবাড়িয়া শহরের পূর্বাঞ্চলে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে একটি খাল খনন করা হয়েছিল। যা এন্ডারসন খাল নামে পরিচিত। এ খালের মাধ্যমে ব্রাক্ষণবাড়িয়া শহর জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়।

সিংহপুরুষ আল্লামা তাজুল ইসলাম দেওবন্দ মাদরাসায় অধ্যয়নকালিন সময় থেকেই কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে বহস ও মোনাজারা শুরু করেন। কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে এবং প্রামাণ্য দলিল প্রমাণের আলোকে তিনি কাদিয়ানিদেরকে পরাজিত করতেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, ও ঢাকা অঞ্চলে অসংখ্যবার তিনি কাদিয়ানীদের মোকাবেলায় অংশগ্রহণ করেন। খোদ ব্রাক্ষণবাড়িয়া শহরে অনুষ্ঠিত এক বাহাসে ফখরে বাঙ্গালের অকাট্য যুক্তি ও প্রমাণের সামনে টিকতে না পেরে পাঞ্জাব থেকে আগত কাদিয়ানি মৌলভিরা সভায় তাদের কিতাবপত্র রেখে পালিয়ে যায়।

তিনি দুটি মসজিদ নির্মাণ করেন মৌলভীপাড়া জামে মসজিদ এবং আনন্দবাজার জামে মসজিদ। বস্তুত কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসাবে তিনি এই মসজিদ নির্মাণ করেন। উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের সফল কাদিয়ানীবিরোধী ব্যক্তিত্ব ছিলেন ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ. এবং পশ্চিমাঞ্চলে ছিলেন হযরত মাওলানা আতাউল্লাহ শাহ বুখারী রহ.।

মাওলানা নিজে আরবি ভাষায় সুপন্ডিত ও অনুপম কাব্য-প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে এমন বিষ্ময়কর মেধা দান করেছিলেন যে, ছাত্রজীবনেই তিনি সুন্দর ও উঁচুমানের আরবি কবিতা অনায়াসেই রচনা করে ফেলতেন। তিনি যখন দিওয়ানে আলি পড়তেন তখন দিওয়ানে আলির সমপর্যায়ের কবিতা তিনি সহজেই মুখে মুখে রচনা করে শুনিয়ে দিতেন। দারুল উলুম দেওবন্দে অধ্যয়নকালে একবার তিনি আরবি কবিতার মাধ্যম কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে বহস করেন। এ বহসে তিনি ৭০ টি আরবি কবিতা রচনা করে তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব প্রদান করেন। তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে তথ্যভিত্তিক দলিল এবং অকাট্য যুক্তির দ্বারা কাদিয়ানীদেরকে কাফের প্রমাণ করার পর উপস্থিত জনতা তাকে ফখরে বাঙ্গাল বা বাংলার গৌরব উপাধিতে ভূষিত করেন।

মাওলানা মরহুম ফখরে বাঙ্গাল জীবনে দুইবার পবিত্র হজ্ব আদায় করেন। হজ্ব ও তাবলীগের সফর উপলক্ষ্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোও সফর করেন। তাছাড়া তাবলীগ জামায়াত নিয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ও মুসলিম জাহানের বিভিন্ন দেশে সফর করেন।

১৯৬৪ সালে পূর্বেকার মাজহাব সমূহ ও আয়েম্মায়ে মুজতাহিদীনের পরিবর্তে নতুন মাজহাব ও মুজতাহিদীন গঠন করা প্রসঙ্গে মিশরের রাজধানী কায়রোতে বিশ্ব উলামা সম্মেলনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হতে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে নতুন মাজহাব এবং মুজতাহিদীন নির্বাচনের প্রস্তাবে যুক্তির মাধ্যমে প্রবল বিরোধিতা করেন। তার তথ্যভিত্তিক ও যুক্তির মাধ্যমে নতুন মাজহাব গঠনের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। ফখরে বাঙ্গাল (রহঃ) কায়রোতে বিশ্ব উলামা সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে বিশ্বের দরবারে এ দেশের এবং দেশের জনগণের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন। উক্ত সম্মেলনে তিনি ফখরুল উলামা বা উলামাদের গৌরব ও হাফিজুল হাদিস উপাধিতে ভূষিত হন।

১৯৬৭ সালের ৩রা এপ্রিল মোতাবেক ১৩৭৩ বাংলা ২০শে চৈত্র রোজ সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাংলার গৌরব আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ. ৭১ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তার খাদেম হযরত মাওলানা মুফতী নূরুল্লাহ রহ. বলেছেন, হযরতের শেষ কথা ছিল আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। শব্দটি মাঝে মাঝে জীবদ্দশায় যেমন তার সুললিত কণ্ঠে বাসায় ও মসজিদে গুঞ্জরিত হত, ঠিক সেই সুরে শেষবারের মত আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করে চিরতরে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তাঁর মরদেহ যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আনা হয়। তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ সমস্ত দোকান-পাট, সরকারী-বেসরকারী অফিস-আদালত মুসলমান ও অমুসলমানের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করেন। স্থানীয় বিশাল জেলা ঈদগাহ ময়দানে তাঁর জানাযা অনুষ্টিত হয়। ইমামতি করেন হযরত মাওলানা সিরাজুল ইসলাম রহ.। জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদরাসা সংলগ্ন দক্ষিণ পার্শ্বে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

আল্লামা তাজুল ইসলাম ছিলেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ইসলামী ব্যক্তিত্ব, মুফাসসিরে কোরআন, মুহাদ্দিস, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, জাতীয় আজাদী আন্দোলনের অন্যতম বীর সৈনিক। ইসলামী জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তার পান্ডিত্য। বাংলাদেশে ইসলামী আদর্শ কৃষ্টি-কালচার শিক্ষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি যে উজ্জ্বলময় অবদান রেখে গেছেন তা সত্যিই এ দেশের ইসলামপ্রিয় জনতার জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়।

====

উলামায়ে কেরাম যুগে যুগে মানবজাতির কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শ ও সঠিক মর্মবাণী প্রচার প্রসারে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পথহারা মানবজাতিকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে দিয়েছেন সঠিক দিকনির্দেশনা। উলামাদের সীমাহীন ত্যাগের কারণেই মানবজাতি আজ ইসলামী আদর্শে আদর্শবান।

আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার প্রসারে যে সকল আলেম উলামা অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতিসন্তান আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহঃ) ’র নাম বিশ্বের দরবারে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহঃ) ছিলেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ইসলামী ব্যাক্তিত্ব, মুফাসসিরে কুরআন, মুহাদ্দিস, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ৷
আজাদী আন্দোলনের অন্যতম বীর সৈনিক। ইসলামী জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তার পাণ্ডিত্য। বাংলাদেশে ইসলামী আদর্শ কৃষ্টি কালচার শিক্ষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি যে উজ্জলময় অবদান রেখে গেছেন তা সত্যিই এ দেশের ইসলাম প্রিয় জনতার জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। বহুমুখী প্রতিভা,মেধা ও কৃতিত্বের জন্য আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহঃ) ফখরে বাঙ্গাল উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন ।

জন্ম: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ভূবন গ্রামে ১৩১৫ হিজরী মোতাবেক ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে। পিতা মাওলানা আনোয়ার আলী (রহঃ) যিনি সমকালীন যুগে একজন প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন।

শিক্ষাজীবন: পিতা মাওলানা আনোয়ার আলী পুত্রের বয়স যখন ৮ কিংবা ৯ বছর তখন তিনি তাকে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করেন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার মাত্র ৯ মাসে বালক তাজুল ইসলাম ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত সকল ক্লাসের পাঠ্যবিষয় মুখস্থ করে ফেলে। স্কুল জীবন শেষে বালক তাজুল ইসলাম স্থানীয় জেঠাগ্রামে মাওলানা আব্দুল করীম এর নিকট প্রাথমিক কিতাবাদি অধ্যায়ন করেন। পরে তিনি শ্রীঘর মাদরাসায় ভর্তি হন। শ্রীঘর মাদরাসার পর হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে অতি সুনামের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে সিলেট আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৩৩৭-৩৮ হিজরীতে সিলেট আলিয়া মাদরাসার সর্বশেষ পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৩৩৮ হিজরীতে আল্লামা তাজুল ইসলাম বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। দারুল উলূম দেওবন্দে ৪বছরে তিনি উচ্চ পর্যায়ে হাদীস, তাফসীর, ফিকহ, আক্বায়েদ ও আরবী সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। দেওবন্দে শিক্ষাজীবনে প্রতিটি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসায় তাজুল ইসলাম (রহঃ) ’র প্রধান পৃষ্টপোষক ও শিক্ষক ছিলেন সমকালীন বিশ্বের শীর্ষ মুহাদ্দেস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমিরী (রহঃ) শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহঃ) শাইখুল আদব মাওলানা এজাজ আলী (রহঃ) ও মুফতী আজিজুর রহমান (রহঃ) ।

কর্মজীবন: ১৩৪২ হিজরীতে দেওবন্দ থেকে ফিরে এসে আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহঃ) সর্ব প্রথম ঢাকা এবং পরে কুমিল্লা জামিয়া মিল্লিয়ায় শাইখুল হাদিস হিসেবে যোগদান করেন। ১৩৪৫ হিজরীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামীয়া ইউনুসিয়া মাদরাসায় প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন। ইন্তেকালের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত দীর্ঘ ৪২ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন যুগে ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহঃ) সমসাময়িক যাদের সাথে এবং যাদেরকে নিয়ে ইসলামের কাজ করেছেন তারা হলেন শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা আতহার আলী (রহঃ) খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ (রহঃ) মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন রহ., মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব পীরজী হুজুর (রহঃ) বাংলার কালোমানিক মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী (রহঃ) মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহঃ) মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) মাওলানা ছফি উল্লাহ চাদপুরী (রহঃ) ও মাওলানা সিরাজুল ইসলাম বড় হুজুর (রহঃ) তাদের অন্যতম।
রাজনীতি: ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহঃ) ছিলেন শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। এ দেশের মানুষ যখন হতাশাগ্রস্থ হয়ে তাদের চারিত্রিক অধঃপতনের কারণে সঠিক পথ ভুলে গিয়ে ইসলামী তাহজিব তামাদ্দুনকে বিসর্জন দিয়ে বৃটিশদের কৃষ্টি কালচারের প্রতি ঝুকে গিয়েছিল তখন পথভ্রষ্ট জাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছিল সর্বাপেক্ষা বেশী।

দেওবন্দে অধ্যায়নকালে বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে স্বীয় উস্তায শাইখুল ইসলাম হযরত শাব্বির আহমদ ওসমানী (রহঃ) ’র একান্ত সহচর হিসেবে কাজ করেছেন ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহঃ) তিনি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলাদেশের অগ্রগামী নেতা। বৃটিশ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এদেশ আবারও যাতে কোন অমুসলিম সম্প্রদায়ের হাতে না যায়, এব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তাই বৃটিশদের সাথে হিন্দুদের আতাত দেখে মুসলমানদের স্বাধীনতা নিয়ে যখন ভারতবর্ষের মুসলিম নেতারা আতঙ্কিত ও সন্দিহান হয়ে উঠলেন, তখন তিনিও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। শাইখুল ইসলাম হযরত উসমানী (রহঃ) শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, শাইখুল ইসলাম মাওলানা আতহার আলী (রহঃ) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হযরত জাফর আহমদ ওসমানী (রহঃ) আল্লামা আজাদ সোবহানী (রহঃ) আল্লামা সোলাইমান নদভী (রহঃ) মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন (রহঃ) ও ফুরফুরা, শর্সিনার তখনাকার পীর সাহেবগনসহ ভারতবর্ষের সকল মুসলিম নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ফখরে বাঙ্গাল (রহঃ) মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি কায়েম তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। সেদিন ১৯৪৭ সনে মুসলমানদের জন্য পৃথক দেশ পাকিস্তান হয়েছিল বলেই আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি।

ফখরে বাঙ্গাল (রহঃ) ১৯৪৫ সনে কলকাতা মোহাম্মদ আলী পার্কে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠাতাদেরও অন্যতম একজন। ১৯৫০ সনে ১৮, ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি ৩দিনব্যাপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ঐতিহাসিক ’মাসিহাতা কনফারেন্সে’ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ফখরে বাঙ্গাল ও মালানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দীন (রহঃ) ’র উস্তাযে মুকাররম শাইখুল ইসলাম হযরত শাব্বির আহমদ উসমানী (রহঃ) ’র নামে ঐতিহাসিক মাছিহাতায় ‘শাব্বির ময়দান’ নামে মাঠের নাম করণ করে সেখানে সেই কনফারেন্স করা হয়। সিলেটের ঐতিহাসিক রেফারন্ডমেও তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। যার দরুন সিলেট আজ স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ। সেদিন ফখরে বাঙ্গালের খালেছ দ্বীনের মুজাহিদরা যদি সিলেটের প্রতিটি গ্রামে-গঞ্জে মুসলিম জাতি স্বত্ত্বাবোধ ও স্বতন্ত্র আবাস ভূমির বিষয়ে গণ আন্দোল সৃষ্টি না করতেন, তাহলে সিলেট আজও হিন্দু ভারতের দখলে থাকতো। সেখানকার মুসলমানরা আজও অমুসলিমদের দ্বারা নির্যাতিত-নিপীড়িত হতো। সিলেট আরেকটি কাশ্মীর, আরাকান হতো। সিলেটের মুসলমানরা আজও পরাধীন থেকে যেতো। কনফারেন্সে অন্যান্য শীর্ষ আলেমদের সাথে তিনিও নিখিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচিত হন। দেশের সকল শ্রেণীর মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্যে যা ১৯৫২ সনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম নাম ধারণ করে। ফখরে বাঙ্গাল (রহঃ) পরবর্তিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির সহ সভাপতি এবং তৎকালীন কুমিল্লা জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সনের ঐতিহাসিক সংসদ নির্বাচনে নেজামে ইসলাম পার্টির মনোনীত ঐতিহাসিক ’হক-আতহার-ভাষানী’ তথা যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসাবে বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলা ও সারাইলের কিছুঅংশ নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। সামান্য ব্যবধানে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হতে না পারলেও তার দল নেজামে ইসলাম পার্টি প্রাদেশিক পরিষদে ৩৬টি আসন লাভ করে এবং কেন্দ্রে পায় ৪টি আসন। যা এখনো পর্যন্ত ভারতবর্ষে কোন ইসলামী দলের সর্বোচ্চ সংসদীয় আসন লাভের রেকর্ড।

ফখরে বাঙ্গাল উপাধি: আলামা তাজুল ইসলাম (রহঃ) দেওবন্দ মাদরাসায় শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে এক বাহাস (তর্কযুদ্ধ) অনুষ্ঠিত হয়। তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে তথ্যভিত্তিক দলিল এবং অকাট্য যুক্তির দ্বারা কাদিয়ানীদেরকে কাফের প্রমাণ করার পর উপস্থিত জনতা তাকে ফখরে বাঙ্গাল বা বাংলার গৌরব উপাধিতে ভূষিত করেন।

বিশ্ব উলামা সম্মেলনে যোগদান: ১৯৬৪ সালে পুর্বেকার মাজহাব সমুহ ও আয়েম্মায়ে মুজতাহিদীনের পরিবর্তে নতুন মাজহাব ও মুজতাহিদীন গঠন করা প্রসঙ্গে মিশরের রাজধানী কায়রোতে বিশ্ব উলামা সম্মেলনে তৎকালীন পুর্ব পাকিস্থান হতে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে নতুন মাজহাব এবং মুজতাহিদীন নির্বাচনের প্রস্তাবে যুক্তির মাধ্যমে প্রবল বিরুধিতা করেন। তার তথ্যভিত্তিক ও যুক্তির মাধ্যমে নতুন মাজহাব গঠনের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। ফখরে বাঙ্গাল (রহঃ) কায়রোতে বিশ্ব উলামা সম্মেলনে পুর্ব পাকিস্তান থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগদিয়ে বিশ্বের দরবারে এ দেশের এবং দেশের জনগণের ভাবমুর্তি উজ্জ্বল করেন। উক্ত সম্মেলনে তিনি ফখরুল উলামা বা উলামাদের গৌরব ও হাফিজুল হাদিস উপাধিতে ভূষিত হন।

বিবাহ ও পারিবারিক জীবন: ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তিনি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ কেরাত বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশে ইলমে কেরাতের প্রবর্তক উজানীর কারী ইবরাহিম সাহেবের তৃতীয় কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। এ স্ত্রী থেকে তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বড় ছেলের নাম ছিল আব্দুল্লাহ। তিনি মজ্জুব প্রকৃতির লোক ছিলেন। দ্বিতীয় ছেলের নাম হাফেজ হাবিবুল্লাহ। প্রথম স্ত্রীর ইন্তেকালের পর তিনি সরাইল থানার দেওরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে দ্বিতীয় বিবাহ করেন। এ স্ত্রীর থেকে দুই ছেলে ও এক মেয়ে জন্ম গ্রহণ করে। প্রথম ছেলের নাম হাফেজ ইমদাদুল্লাহ আর দ্বিতীয় ছেলের নাম হাফেজ ওয়ালি উল্লাহ। মেয়ের নাম নাসিমা খাতুন।

ইন্তেকাল: ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহঃ) ১৯৬৭ সালের ৩ রা এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭১ বৎসর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

তিনি ছিলেন এক বর্নাট্য জীবনের অধিকারী, সারাটি জীবন দ্বীনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
তিনি ছিলেন মুসলিম সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তিত্ব। তার বর্নাঢ্য জীবনটাই ছিল ইসলামের এক ইতিহাস।

Tags: ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *