Shaanxi, China
sazib.online@gmail.com

পিলখানা হত্যাকান্ডে ভারতের ‘র’

পিলখানা হত্যাকান্ড

পিলখানা হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে এমন এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা যেখানে নিজের স্বদেশে, নিজের আবাসস্থলে কোনো যুদ্ধ ব্যতীত ৫৭ জন উচ্চ র‍্যাংকধারী অফিসার হত্যার নজির আর কোথাও নেই। প্রতি বছর এই দিনটি আসলে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। তবে অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জার বিষয় প্রতি বছরের ন্যায়, এই বছর আমরা এই দিনটিকে তেমন কোনো বিশেষ মর্যাদা দিতে দেখলাম না। টিভি-চ্যানেল, পত্র-পত্রিকায় তেমন কোনো লেখালেখি আমার চোখে পড়ার মত ছিল না।

এই দিনটিকে হয়তো কারো মনে নেই অথবা কেউ ইচ্ছা করে মনে রাখতে চাচ্ছেন না। আমার লিস্টে যতজন চেতনাধারী বা আওয়ামী সমর্থক আছেন তাদের এক্টিভিটি গুলা লক্ষ্য করছিলাম, তেমন কিছু পেলাম না। অনেকের দেওয়ালে পাপিয়াদের কন্টেন্টে ভরপুর অবস্থা। কে জানে এই পিলখানা হত্যাকান্ডের আবেগ জাতির মস্তিষ্ক থেকে ডিলেট করার জন্য পাপিয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে কি না? কেননা আমাকে কেউ এটা বুঝাতে আসবেন না যে পাপিয়াদের কুকর্ম আগে কেউ জানতো না, এটা এই প্রথমই জেনেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পিলখানা হত্যাকান্ডে ভারতের ‘র’ এর ভূমিকা নিয়ে কিছু লিখতে চাই আজ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে বারবার একটি সংস্থার নাম সবার প্রথমে বলা হচ্ছে, সেটি হচ্ছে ভারতের ‘র’। মানে এই পিলখানা হত্যাকান্ড ভারতের ‘র’য়ের একটা মাস্টারমাইন্ড প্লান। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিডিয়ারের সাথে ‘র’ য়ের শ্ত্রুটা কোথা থেকে আসলো বা ‘র’ বিডিয়ার জওয়ানদের হত্যায় বা কেন করতে চাই? প্রশ্নটা মাথায় রাখুন, উত্তর সবার শেষে মিলাবো।

যারা ২০০১ সালের ‘বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ‘ নিজের চোখে দেখেছেন অথবা যারা এই ঘটনা পরবর্তিতে বিভিন্ন মাধ্যমে পড়াশোনা করেছেন, তাদের কাছে এই ব্যাপারটা সহজ হবে, নতুবা উইকিপিডিয়ায় এই ঘটনার পূর্নাঙ্গ ঘটনা পড়ে নিবেন সময় করে। কেননা ঘটনার সূত্রপাত সেখান থেকেই।

ভারত ও বাংলাদেশের কিছু আন্তর্জাতিক অমীমাংসিত সীমান্তের জের ধরে ২০০১ সালের ১৫ এবং ১৬ এপ্রিল সিলেট সীমান্তের পদুয়ায়, ১৮ এপ্রিল কুড়িগ্রামের রৌমারী এবং ১৯ এপ্রিল পুনরায় পদুয়া সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের সাথে বিডিআরের সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এই তিনটি যুদ্ধেই বাংলাদেশের সে সময়ের বিডিআরের জোয়ানরা বিজয় অর্জন করে। এই যুদ্ধে রৌমারী সীমান্তে প্রায়ই ১৫০জন বিএসএফ ও পদুয়া সীমান্তে প্রায়ই ১৫জন বিএসএফ নিহত হয়।

তৎকালীন ২০০১ সালের বিডিআরের মহাপরিচালক ছিলেন মেজর জেনারেল এ,এল,এম ফজলুর রহমান। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশী বিডিয়াররা, ভারতীয় বিএসএফকে কোণঠাসা করে দিয়েছিল সেই যুদ্ধে। যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের বর্ডারের ছোট্ট একটা ভূমি নিয়ে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশীদের যুদ্ধের ট্রেনিং দেওয়া হত। পরে সেটা ভারত তাদের নিজেদের ভূমি দাবি করেছিল।

২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল, ভারতীয় বিএসএফ প্রথম কুড়িগ্রামের রৌমারীর বিডিআর ক্যাম্প দখলের অপচেষ্টা করে। বিএসএফ এর এই আগ্রাসী হামলাকে প্রতিহত করে মাত্র ১০ জন বিডিয়ার জওয়ান। এই ঘটনাটিকে বিডিআরের সর্বকালের সেরা সাহসিকতাপূর্ণ অভিযান হিসেবে এখনো বিবেচ্য করা হয়। পরে এই দশজন বিডিয়ার জওয়ানকে বীরসেনানির সম্মান দেন বিডিয়ার।

এই যুদ্ধের পর এতগুলা বিএসএফ নিহত হওয়ার পর তৎকালীন ভারতীয় ডিফেন্স মিনিস্টার জসবন্ত সিং বলেছিলেন ‘এই ঘটনার বদলা নেওয়া হবে’। মূলত বাংলাদেশের বিডিয়ারের সাথে ভারতের মূল সমস্যাটা সৃষ্টি হয় এই ঘটনা থেকে। যেহেতু ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং সেই সরকারকে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধে বিডিয়ার জওয়ানরা গিয়েছিল, সেহেতু ভারত তখন কোনো সুবিধা করতে পারেনি।

বিডিয়ার পূর্বে পাকিস্তান রাইফেলস ছিল পরে এটি বাংলাদেশ রাইফেলসে নাম পরিবর্তন করে। এই বাহিনীটি একটি আধাসামরিক বাহিনী। যার কমান্ড ও ট্রেনিং অনেকটা সেনাবাহিনীর মত আর এই বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা সবাই সেনাবাহিনীর ব্যাকগ্রাউন্ড অন্যদিকে ভারতী বিএসএফ সিভিল বাহিনী ও তাদের ট্রেনিং ও জনবল খুবই নিম্ন মানের। সহজ ভাষায়, সামরিক পেশাদারিত্ব ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় বিজিবির কাছে বিএসএফ অনেকটা বিড়ালের বাচ্চার মত।

এখন আসুন, পিলখানায় হত্যাকান্ডে যায়, যেহেতু যুদ্ধটি বিএনপি সরকারে আমলে শুরু হয়েছিল, সেহেতু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এর প্রতিশোধ কখনই নেওয়া সম্ভব না। তাই দীর্ঘ ৮ বছর পর যখন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে, তখন তারা সেটাকে একটা আদর্শ সময় হিসেবে ধরে নিলো। আপনি যদি বিডিয়ার হত্যাকান্ডের পুরো ঘটনাটা জেনে থাকেন তাহলে আপনার জন্য সুবিধা হবে পুরো ব্যাপারটা। বিডিয়ারের যত উচ্চ পদস্থ অফিসার আছে, তাদের সবাইকে সারা বাংলাদেশ থেকে একটি অনুষ্ঠানের নামে একত্রিত করা হয়েছিল সেইদিন।

আর কিছু কিছু অফিসারকে সদ্য সেনাবাহিনী থেকে বিডিয়ারে কোনো কারন ছাড়াই বদলি করিয়ে নেওয়া হয়, র‍্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইং এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কর্নেল গুলজার আহমেদকেও বদলি করে বিডিআরের সেক্টর কমান্ডার (সিলেট) পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কারন হচ্ছে এই সকল অফিসারদের যদি বিডিয়ারে ট্রান্সফার করা না যায় তাহলে তাদের পিলখানায় নেওয়া যাবে না আর তাদের সেখানে না নেওয়া গেলে পরিকল্পনা সফল হবে না।

আর যেহেতু আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় ছিল সেহেতু তাদের পরিবর্তন করাটা খুব সহজ ছিল। তারপর তাদের পিলখানায় একে একে হত্যা করা হয়। এটা যে পূর্ব পরিকল্পনা ছিল সেটা আরো পরিষ্কার হয়ে যায়, যখন ভারতের ‘২৪ ঘন্টা’ টিভিতে ঐদিন সকাল ১১টায় প্রচার করা হয় জেনারেল শাকিল সস্ত্রীক নিহত। অথচ বাংলাদেশের কোনো মিডিয়া জানে না আর শাকিল আহমেদ যে মারা গেছে সেটা ঘটনার কয়েকদিন পর নিশ্চিত হয়েছিল কেননা লাশ গুলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন ছিল।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কর্নেল গুলজার আহমেদের অপরাধ কি? এখন আবার কিছু সময়ের জন্য পিছনে ফিরে যায়, ২০০৫ সালের ‘সেই ১৭ আগস্ট’ সারাদেশে প্রকাশ্যে জঙ্গীদের বোমা হামলার ঘটনা ঘটলে কর্নেল গুলজার আহমেদের নেতৃত্বে জঙ্গীদের বিরুদ্ধে পাল্টা গ্রেফতার অভিযান শুরু হয়। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা ভাইসহ জেএমবির তখনকার শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সব নেতা ধরা পড়ে। তখন বিএনপি সরকারের আমলে বাংলা ভাইকে ফাঁসির রায় দেওয়া হয়।

বাংলা ভাই ছিলেন যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সংসদের হুইপ মীর্জা আজমের আপন দুলাভাই। পিলখানা হত্যাকান্ডে কর্নেল গুলজারের দুটি চোখ তুলে ফেলা হয়েছিল, তাঁর পুরো শরীর নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল, তাঁর শরীরে আগুন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর লাশ নর্দমা থেকে উঠানোর পর কেউ শনাক্ত করতে পারেনি, ১৫দিন পরে DNA টেস্ট করে তাঁর লাশ শনাক্ত করা হয়। বলা হয়েছিল, তাঁর লাশের উপর সবচেয়ে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছিল।

একটা জিনিস লক্ষণীয়, পিলখানা হত্যাকান্ডে সাধারণ কোনো সৈন্য নেই। মাত্র একজন ক্যাপ্টেন রয়েছে আর সবাই মেজর থেকে উর্ধ্বতন পর্যায়ের অফিসার। ডিএডি তৌহিদসহ যারা এই ঘটনায় ছিলেন, সেই বিডিয়ার জওয়ানরা ক্যামেরাই বলেছিল তাদের বেতনভাতা বৃদ্ধি ও সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশ যাতে বিডিয়ারে না হয়, এইগুলা নিয়ে মূল বিদ্রোহ তাদের। তাহলে এই ভয়াবহ হত্যাকান্ড কেন, যেখানে এই ঘটনার আগের দিন জেনারেল শাকিল আহমেদ একটি টিভিতে তাঁর জওয়ানদের দাবী গুলা নিয়ে আলোচনা করেছেন, সমস্যা সমাধানের জন্য, সেখানে কেন এই হত্যাকান্ড?

বিডিআর বিদ্রোহ

এটা কখনই বিশ্বাসযোগ্য না যে, সামান্য বেতনভাতা বৃদ্ধির জন্য জওয়ানরা তাদের অফিসারদের হত্যা করবে। যেখানে বেতনভাতা বৃদ্ধির ব্যাপার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের, যেহেতু বিডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এটা কিভাবে বিশ্বাস করা যায়, আমার অধীনস্থ সৈন্য আমাকে হত্যা করবে, অতএব এইসব ছয়-নয় দিয়ে মূল বিষয় আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

ভারতের দাসত্ব মেনে নেওয়ার প্রথম ধাপ হচ্ছে পিলখানা হত্যাকান্ড। এই হত্যাকান্ডের আগের আর পরের বিডিয়ার-বিজিবির প্রার্থক্য করলে ব্যাপারটা সহজ হয়ে যাবে। যেখানে সামান্য একটা ভূমির জন্য বিডিয়ার প্রাণ দিয়েছিল স্বেচ্ছায়, সেখানে সেই বাহিনীর সামনেই বাংলার মানচিত্র তিলে তিলে চিবিয়ে খাচ্ছে ভারতীয় হায়েনারা। অথচ বিজিবি কিছুই করছে না, পতাকা বৈঠকে বাঙ্গালীর লাশ গুলা নিয়ে আসছে, এটা অস্বাভাবিক লাগছে না আপনার কাছে?

বাইরের দেশের গণমাধ্যম আমাদের বিজিবি প্রধানকে ‘ক্যাসিনো জেনারেল’ টাইটেলে নিউজ করে। এইগুলা লজ্জার, এইগুলা শত বছরের পুরাতন একটা আদর্শিক বাহিনীর অপমৃত্যু। এই যে বিএসএফ হটাত করে এত শক্তিশালী হয়ে গেল, পাখির মত বাঙ্গালী হত্যা করতেছে, সীমান্ত অতিক্রম করে এই দেশে লুটপাট করতেছে, এইগুলায় হচ্ছে ঐ ২০০১ সালের তাদের বিএসএফ হত্যার প্রতিশোধ।

না আমাদের বাহিনী অক্ষম হয়ে যায় নাই, বিজিবি অন্ধও না, বিজিবিকে অন্ধ বানানো হয়েছে। কারা অন্ধ বানায়ছে, যাদেরকে আপনি ভারতের পায়ে চুম্বন দিতে টিভিতে দেখেন, যাদেরকে আপনি ভারতের পক্ষে সাফাই গাইতে শুনেন, যাদের আপনি আপনার প্রতিনিধি বলে অভিবাদন করেন।

আমি বিশ্বাস করি, যেমনভাবে একাত্তরের রাজাকারদের বিচার এই দেশে হয়েছে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এই দেশে হয়েছে, ঠিক তেমনীভাবে শত-হাজার বছর পরও আমার ৫৭জন অফিসার হত্যার বিচার হবে, এই বাংলার মাটিতে। খোদা হাফেজ।

মোঃ সজীবুর রহমান সজীব

২৬।০২।২০২০ আনকাং সিটি, চীন

Tags: , , ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *