Shaanxi, China
sazib.online@gmail.com

আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও আপোষহীন নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা

আপনারা হয়ত কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ট্রোকে ভুলে যান নাই, অথবা আধুনিক মালেশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, অথবা লিবিয়ার গাদ্দাফি নতুবা গণচীনের মাও সেতুংকে।

তারই ধারাবাহিকতায় আপনাদের হয়তো ভুলে যাওয়ার কথা না, আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে। এই মানুষটাকে প্রায় ২৭ বছর একটি দ্বীপের জেলে রাখা হয়েছিল। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন।

তিনি যখন কারামুক্ত হলেন, তখন সমস্ত বিশ্ব তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। তাঁর জীবদ্দশায় তাকে নোবেলসহ প্রায় ২৫০টিরও অধিক পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়েছিল। এমনকি তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ তাকে সেই দেশের ‘জাতির জনকে’ ভূষিত করেন।

আমার এই কথাগুলো প্রথমে সেট করে দেওয়ার একটা খুব সুন্দর উদ্দেশ্য আছে, যেটা পরবর্তী লেখাগুলা পড়লেই বুঝতে পারবেন।

আমরা ম্যান্ডেলার জীবনী থেকে একটা শিক্ষা নিতে পারি, সেটা হচ্ছে নিরপরাধ মানুষকে ক্ষমতা দিয়ে যুগের পর যুগ জেলে ভরে রাখা যায়। পরবর্তী লেখা বুঝার স্বার্থে শুধু এই পয়েন্টটা মাথায় রাখুন।

বাংলাদেশের প্রথম ও তিনবারের মহিলা প্রধানমন্ত্রী, একইসাথে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মাঝে দ্বিতীয় মহিলা সরকারপ্রধান ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে নিজস্ব ৫টি সংসদীয় আসনের সবগুলোতেই জয়ী ছিলেন। বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাবান নারী নেতৃত্বের তালিকায় ২০০৪ সালে তাঁর অবস্থান ১৪তম, ২০০৫ সালে ২৯তম, ও ২০০৬ সালে ৩৩তম ছিল। এটা হচ্ছে খালেদা জিয়ার সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

আধা-সামরিক সরকারের আমলে অর্থাৎ ২০০৮ সালে জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্টের দূর্নীতির অভিযোগে বেগম জিয়াকে একটা মামলা দেওয়া হয়। সেই মামলাটির অন্যতম সুপারিশধার ছিলেন জেনারেল হাসান মাশহুদ চৌধুরী। যিনি সাবেক সেনাপ্রধান ও দুদকের চেয়ারম্যান ছিলেন।

যারা আমার লেখা নিয়মিত পড়ে থাকেন, তারা হয়তো দেখেছেন উনার বিরুদ্ধে আমি পূর্বেও লিখেছি। ফখরুদ্দিনের আমলে ২২২ জন শীর্ষ দূর্নীতিবাজদের একটা তালিকা করেছিলেন জেনারেল হাসান মাশহুদ চৌধুরী। যেখানে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় অনেক নেতানেত্রীর নাম উঠে এসেছিল।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই জেনারেল হাসান মাশহুদ চৌধুরী একইসাথে ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানও ছিলেন। তাকে তৎকালীন ট্রাস্ট ব্যাংকের ধ্বংসের কারিগর বলা হত। তার নামে ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রায় ২৩ কোটি টাকা দূর্নীতির অভিযোগ উঠে। অর্থাৎ যিনি মানুষের দূর্নীতির তথ্য ফাঁস করেন, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস শেষে তার দূর্নীতি ফাঁস হয়ে গেল।

এই হাসান মাশহুদ চৌধুরী অর্থাৎ ২০০৮ সালের তৎকালীন নাটকীয় দুদকের হাত ধরেই খালেদা জিয়ার নামে মামলা হয়। শুধু তাই নয় অবৈধ আধা-সামরিক সরকারের আমলে খালেদা জিয়া প্রায় ১৩ মাস কারাভোগ করেছিলেন রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধনের তিনটি মামলায়। আর সেই সকল মামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন হাসান মাশহুদ চৌধুরী।

তারপর সেই মামলার ১০ বছর পর, খালেদা জিয়ার উপর দূর্নীতির অভিযোগ এনে ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড, তারেক রহমানসহ বাকি সবাইকে ১০ বছরের কারাদন্ড ও ৫ আসামীর ২ কোটি ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করেন আদালত তথা আওয়ামীলীগ সরকার। (এখানে আপনারা শুধু পয়েন্ট করে রাখেন খালেদা জিয়ার ২ কোটি টাকা দূর্নীতির অভিযোগে ৫ বছরের কারাদন্ড হয়েছে।* )

আপনি যদি গত ১০ বছর অর্থাৎ ২০০৮-১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের দূর্নীতি ও টাকা পাচারের পরিসংখ্যান দেখেন, তাহলে দেখতে পাবেন গত ১০ বছরে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই টাকাগুলা কোন দেশপ্রেমিক সৎ নেতানেত্রীরা পাচার করেছে? আপনি যদি বলেন আওয়ামীলীগ করে নাই তাহলে নিশ্চয়ই খালেদা জিয়া বা বিএনপি করেছে। তাহলে এই ১০ বছরের ৬ লাখ কোটি টাকার দূর্নীতির অভিযোগে কেন কোনো নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বা দুদক মামলা দায়ের করে নাই?

আপনারা পত্রপত্রিকা, টিভি-চ্যানেলে প্রায় দেখে থাকবেন, অবৈধ আওয়ামী সরকারের অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন তিনি দূর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেন। যারই ফলশ্রুতিতে বাঘা বাঘা দূর্নীতিবাজদের ইদানিং আইনের আওতায় দেখা যাচ্ছে।

আপনারা যদি ভেবে থাকেন একজন ক্যাসিনো শামীম আরেকজন ক্যাসিনো সম্রাটকে ধরলেই এই সরকার দুধের মত পবিত্র হয়ে যাবে, তাহলে ভুল ভাবছেন। একজন শামীম, আরেকজন সম্রাটকে ধরলেই আওয়ামীলীগের দূর্নীতি শেষ হয়ে যাবে না বা তারা বৈধ সরকারে পরিনত হবে না।

পত্রিকায় এসেছে, ক্যাসিনো শামীম নাকি ১৫’শ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন নেতানেত্রীদের তার ক্যাসিনো ব্যবসা ঠিকিয়ে রাখার জন্য। অর্থাৎ তারা একটা ইনসাফভিত্তিক বন্টন ব্যবস্থা প্রায় বহু বছর ধরে অনুসরণ করে আসছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ক্যাসিনো ক্যান্সাররা কি মাত্র ১-২ মাস ধরেই এই ব্যবসা চালিয়ে আসছে নাকি বছরের পর বছর ধরে তারা এটা চালিয়ে আসছে? আর তাদের কেন পূর্বে ধরা হয় নাই তখন জিরো টলারেন্স নীতি কোথায় পিকনিক করতে গিয়েছিল?*

পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলে রাখা ভাল, অবৈধ সামরিক সরকারের আমলে শুধু খালেদা জিয়া কিন্তু জেলে যায় নাই, শেখ হাসিনাও গিয়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে শেখ হাসিনার মত পূতপবিত্র নেত্রীকে কেন জেলে নেওয়া হয়েছিল? অথবা শেখ হাসিনার নামে সামরিক সরকারের সাড়ে চৌদ্দ হাজার কোটি টাকার দূর্নীতির মামলাগুলো এখন কোথায়?

যদি ২ কোটি টাকার মামলায় ৫ বছরের জেল হতে পারে, তাহলে সাড়ে চৌদ্দ হাজার কোটি টাকার মামলায় কত বছরের জেল হতে পারে পাঠক মিলিয়ে নিবেন, আমি আবার অংকে ততটা ভাল না।

খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়ে যাওয়ার একদিন আগে তিনি বলেছিলেন, “আপনাদের খালেদা কোনো অন্যায় করেনি, কোনো দূর্নীতি করেনি” তাঁর এই দৃঢ় সাহসিকতার উত্তরেই বলে দেয় তিনি দূর্নীতি করেছিলেন নাকি তাকে রাজনৈতিকভাবে নেলসন ম্যান্ডেলার মত ফাঁসানো হয়েছিল। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন প্রথমে আমি কেন ম্যান্ডেলার উদাহরণটি সেট করেছিলাম।

খালেদা জিয়াকে তাঁর দলের লোকেরা বারবার জামিনে বের করার প্রস্তাব দিলে, তিনি বারবারই ফিরিয়ে দিয়েছেন। যেটা ছিল আরেকটা বড় প্রমাণ তাঁর সততার।

আমি এখানে, কোনোভাবেই খালেদা জিয়ার সাফাই গাইতে আসি নাই। তবে সত্য চির অম্লান, তাকে কোনো কিছু দিয়ে ডেকে রাখা যায় না। তবে আমি এটাও বলছি না তাঁর জীবদ্দশায় তিনি কোনো দূর্নীতি করেন নাই যেহেতু আমি হাজির-নাজির নয়। এটা তাঁর আর আমার স্রষ্টায় ভাল জানেন।

নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর পর জেল থেকে বের হওয়ার পরই কিন্তু ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, কে জানে খালেদা জিয়া ৫ বছর পর জেল থেকে বের হওয়ার পর আরেক ইতিহাস সৃষ্টি করে কি না? সেই দিনটির অপেক্ষায় রইলাম, আরেকটি ইতিহাস লিখবো বলে…

©️ MD Sazibur Rahman Sajib
10/06/2019 || Shaanxi, China

Tags: , , ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *